শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তা Primary TET, D.El.Ed এবং B.Ed পরীক্ষার্থীদের জন্য একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও স্কোরিং বিষয়। বাংলা পেডাগজি (Bengali Pedagogy) সিলেবাসে মাতৃভাষা শিক্ষার উদ্দেশ্য, উপযোগিতা এবং বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশ থেকে প্রতি বছরই প্রশ্ন আসে। নিচে Importance of Mother Tongue in Education for Primary TET নিয়ে একটি সম্পূর্ণ ও তথ্যবহুল আলোচনা করা হলো। এই আর্টিকেলে শিক্ষাবিদদের অপরিবর্তিত মতামত ও বিভিন্ন শিক্ষা কমিশনের (Education Commissions) সুপারিশগুলিও বিস্তারিতভাবে দেওয়া হয়েছে, যা Mother Tongue as Medium of Instruction সম্পর্কে আপনার ধারণাকে আরও মজবুত করবে।
মাতৃভাষা শিক্ষার উদ্দেশ্য
মাতৃভাষা শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্যগুলিকে মূলত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন— শিক্ষার্থীর আচরণগত পরিবর্তন, সার্বিক বিকাশ, গ্রহণ করার ক্ষমতা (অর্থাৎ পঠন ও শ্রবণ) বৃদ্ধি এবং প্রকাশ করার দক্ষতা (অর্থাৎ কথন ও লিখন) তৈরি করা। এছাড়াও বৌদ্ধিক, প্রাক্ষোভিক ও মনঃসঞ্চালনমূলক বিকাশ ঘটানোও মাতৃভাষা শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য।
শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষার গুরুত্ব
প্রায় সব শিক্ষাবিদই মাতৃভাষাকে শিক্ষার প্রধান মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। দীর্ঘ চেষ্টার ফলে বর্তমানে আমাদের দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে মাতৃভাষায় পঠনপাঠন সুনিশ্চিত হয়েছে এবং উচ্চশিক্ষাতেও এটি বেশ সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। আগামী দিনে প্রায় সব বিষয়ের পাঠ্যপুস্তক মাতৃভাষায় লেখা সম্পূর্ণ হবে বলে আশা করা যায়।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাতৃভাষায় শিক্ষাদানকে মাতৃদুগ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আমরা জানি যে, শিক্ষার্থীরা তাদের মাতৃভাষাতেই সবচেয়ে সহজে ও স্বাভাবিকভাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। যেকোনো শিক্ষণীয় বিষয় মাতৃভাষার মাধ্যমে তারা খুব দ্রুত আয়ত্ত করতে পারে। এর পরিবর্তে বিদেশি ভাষায় শিক্ষা দিলে শিক্ষার্থীদের শেখার পথে বড়ো রকমের বাধার (Barrier) সৃষ্টি হয়, বিষয়টি বুঝতে অনেক বেশি সময় লাগে এবং পড়াশোনায় কোনো আনন্দ থাকে না। এছাড়া, আমাদের বাংলা ভাষার সাথে ইংরেজি বা অন্যান্য ভারতীয় ভাষার উচ্চারণ, শব্দ বা পদবিন্যাসের বিশেষ কোনো মিল নেই। তাই মাতৃভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় পড়লে শিক্ষার্থীদের বাধ্য হয়ে মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভর করতে হয়। এর ফলে বিষয়বস্তু কিছুটা জানা গেলেও, শিক্ষার্থীর নিজস্ব ধ্যানধারণার সঙ্গে বিষয়ের গভীরে কোনো সংযোগ তৈরি হয় না। তাই মাতৃভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম করা একান্ত প্রয়োজন।
মাতৃভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম করলে আমরা নিম্নলিখিত সুফলগুলি পেতে পারি:
১। জীবনের ভাষা: জন্মের পর থেকেই শিশুর জীবনের সাথে মাতৃভাষার গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। স্কুলে যাওয়ার আগে থেকেই সে এর মাধ্যমে নিজের মনের ভাব আদানপ্রদান করতে শেখে। তাই মাতৃভাষায় শিক্ষা দিলে জীবনের সাথে শিক্ষার সরাসরি যোগসূত্র গড়ে ওঠে এবং এটি জীবনকে প্রকাশ করার ভাষা হয়ে দাঁড়ায়।
২। চিন্তা ও ভাষার সংগতিসাধন: মাতৃভাষার সাহায্যেই চিন্তা এবং ভাষার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব। সাবলীলভাবে ও সুষ্ঠুভাবে নিজের চিন্তাধারা প্রকাশ করার জন্য এর কোনো বিকল্প নেই।
৩। কল্পনাশক্তি বিকাশের সহায়ক: শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তাশক্তি ও কল্পনাশক্তির উন্মেষ ঘটাতে মাতৃভাষা বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
৪। সময় ও শক্তির অপচয় রোধ: বিদেশি ভাষায় কোনো বিষয় শিখতে যে সময় ও পরিশ্রম লাগে, মাতৃভাষায় তা অনেক কম সময়ে আয়ত্ত করা যায়। এর ফলে শিক্ষার্থীদের শ্রম ও সময়ের অপচয় নিবারিত হয়।
৫। বলা ও লেখার সহজতর মাধ্যম: মাতৃভাষার সাহায্যে যেকোনো বিষয় সহজেই বলা (Speaking) এবং লেখা (Writing) যায়।
৬। পাঠে আনন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্য: মাতৃভাষায় পড়াশোনা করলে শিশুরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে এবং নতুন বিষয় সম্পর্কে জানতে আনন্দ পায়, যা তাদের মধ্যে পড়াশোনার সুঅভ্যাস গড়ে তোলে।
৭। সৃজনশীল কর্মে অনুপ্রেরণা: মাতৃভাষায় শিক্ষা পেলে শিক্ষার্থীরা নানা ধরনের সৃজনশীল কাজে নিজেদের যুক্ত করতে উৎসাহিত বোধ করে।
৮। আত্মবিকাশ ত্বরান্বিত করা: স্বতঃস্ফূর্ত আত্মবিকাশ, যুক্তিনির্ভর ভাবনা ও মুক্তচিন্তার প্রসারে মাতৃভাষার অবদান অপরিসীম, যা আত্মবিকাশকে আরও শক্তিশালী করে।
৯। ব্যক্তিত্ব বিকাশের সহায়ক: মাতৃভাষার সঠিক চর্চা শিক্ষার্থীর মানসিক পুষ্টি জোগায় এবং চিত্তের প্রসার ঘটায়। চিন্তা, কাজ ও অনুভূতির মধ্যে সামঞ্জস্য ঘটিয়ে এটি চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব গঠনে সাহায্য করে।
১০। ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি আস্থা: মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দিলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উন্নত রুচিবোধ এবং জাতীয় সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়। দেশের ঐতিহ্য সম্পর্কে তারা শ্রদ্ধাবান হয়। জাতীয় সাহিত্য পড়ার মাধ্যমে যে আবেগ মূল্য (Emotional value) জন্মায়, তা বিদেশি ভাষায় কখনোই সম্ভব নয়।
মাতৃভাষার উপযোগিতা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাতৃভাষাকে মাতৃদুগ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। মাতৃদুগ্ধ যেমন শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক বিকাশে অপরিহার্য, মাতৃভাষাও তেমনি মানুষের মানবিক সত্তার স্বাভাবিক বিকাশে অত্যন্ত জরুরি। মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার অনুভূতিগুলো সবচেয়ে ভালোভাবে মাতৃভাষাতেই ফুটে ওঠে। সাহিত্য ও শিল্প সৃষ্টির পাশাপাশি সামাজিক আদানপ্রদানের জন্য এটি এক শক্তিশালী মাধ্যম। বিদেশি ভাষায় চূড়ান্ত দক্ষতা না থাকলে তা থেকে প্রকৃত রস আস্বাদন করা যায় না, মাতৃভাষাই সেই উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে। আমাদের চেতন ও অবচেতন মনে চিন্তার প্রক্রিয়া মাতৃভাষাকে অবলম্বন করেই চলতে থাকে। তবে শুধুমাত্র মাতৃভাষার চর্চা করলেই হবে না, জ্ঞানভান্ডার বাড়াতে অন্যান্য বিদেশি ভাষাও শেখা প্রয়োজন, কিন্তু তা কখনোই মাতৃভাষাকে অবহেলা করে নয়।
বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মাতৃভাষার উপযোগিতা নিচে আলোচনা করা হলো:
১। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মাতৃভাষার উপযোগিতা:
সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে সামাজিক নানা দায়িত্ব পালনে এবং পারস্পরিক সম্পর্ক মজবুত করতে মাতৃভাষা অত্যন্ত জরুরি।
- (ক) জাতীয় ঐতিহ্যের পরিচয়: মাতৃভাষায় লেখা সাহিত্য (কাব্য, নাটক, গল্প) পড়ার মাধ্যমে আপন সমাজ ও জাতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ে এবং জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা জন্মায়। এর অভাব মানুষকে দেশ সম্পর্কে উদাসীন করে তোলে।
- (খ) বংশগত ঐতিহ্য রক্ষা: পূর্বপুরুষদের কীর্তি ও বংশগৌরব জানতে এবং তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে মাতৃভাষার দরকার অনস্বীকার্য।
- (গ) সামাজিক গুণের বিকাশ: পরমতসহিষ্ণুতা, বন্ধুপ্রীতি, সহানুভূতি ইত্যাদি সামাজিক গুণাবলি মাতৃভাষা চর্চার মাধ্যমেই বিকশিত হয়। এগুলির অভাবে শিক্ষার্থীরা ঈর্ষাপরায়ণ ও অসামাজিক হয়ে পড়তে পারে।
- (ঘ) সুনাগরিক গঠন: দেশের প্রতি ভালোবাসা, কর্মে সততা, প্রগাঢ় অনুভূতি এবং বলিষ্ঠ চিন্তাশক্তির মাধ্যমে সুনাগরিক গড়ে তুলতে মাতৃভাষা সাহায্য করে।
- (ঙ) জাতীয় সংহতি ও চেতনা: ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের উৎসব, সংস্কৃতি এবং মহাপুরুষদের বাণী পড়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জাতীয় সংহতি, বিশ্ব-ভ্রাতৃত্ববোধ, শান্তি ও প্রগতির আদর্শ জাগ্রত হয়। ভারতের আধ্যাত্মিক ভাবনার সুর শিক্ষার্থীদের ছোটোবেলা থেকেই মাতৃভাষার মাধ্যমে শেখানো উচিত।
- (চ) প্রগতিশীল চিন্তার বিকাশ: বিশ্বের নতুন আবিষ্কার বা দৈনন্দিন খবরগুলি মাতৃভাষায় অনূদিত বই বা সংবাদপত্রের মাধ্যমে সহজেই শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছায় এবং তারা প্রগতিশীল চিন্তাধারার সাথে পরিচিত হতে পারে।
২। ব্যক্তিগত দিক থেকে মাতৃভাষা চর্চার উপযোগিতা:
শিক্ষার্থীদের আত্মবিকাশে মাতৃভাষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
- (ক) সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ: শিল্পকর্ম, চিত্রাঙ্কন, ভাষাগত দক্ষতা বা সাহিত্যসৃষ্টির মতো শিক্ষার্থীদের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনার বিকাশ ঘটায়।
- (খ) শিশুদের ক্রমবিকাশ: শিক্ষকের বক্তব্য সহজে গ্রহণ করতে এবং নিজের কথা গুছিয়ে প্রকাশ করতে মাতৃভাষা সাহায্য করে, যা তাদের কল্পনা ও বিচারশক্তি বাড়ায়।
- (গ) চাহিদার পরিতৃপ্তি: গল্প বা কবিতা লেখা, ডায়েরি লেখা ইত্যাদির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আত্মপ্রকাশ, সৃজনশীলতা ও সৌন্দর্য-পিপাসার আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়।
- (ঘ) চরিত্র গঠন: বীর শিবাজি, রানাপ্রতাপ বা সুভাষচন্দ্রের মতো আদর্শ চরিত্রদের জীবনী মাতৃভাষায় পড়ে শিক্ষার্থীরা অনুপ্রাণিত হয় এবং বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব গঠনে সক্ষম হয়।
- (ঙ) অন্যান্য বিষয় শেখা: বিজ্ঞান, ভূগোল বা ইতিহাস সাবলীলভাবে প্রকাশ করতে এবং শুদ্ধভাবে লিখতে মাতৃভাষার সঠিক প্রয়োগ জরুরি।
- (চ) জীবনকেন্দ্রিক শিক্ষা: জীবনের নানা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার যে জীবনকেন্দ্রিক শিক্ষা (Life-centric education), তা মাতৃভাষা ছাড়া কখনোই সম্পন্ন হওয়া সম্ভব নয়।
- (ছ) অনুভূতির প্রকাশ: আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ, প্রীতি-ভালোবাসা মাতৃভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় পুরোপুরি প্রকাশ করা একেবারেই অসম্ভব।
৩। জাতীয় সাহিত্য সৃষ্টি:
জাতির কৃষ্টি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং চিন্তাধারার সামগ্রিক রূপ জাতীয় সাহিত্যের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়, যা মাতৃভাষা ছাড়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তাই জাতীয় সাহিত্য সৃষ্টিতে মাতৃভাষা চর্চা অপরিহার্য।
মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার সপক্ষে শিক্ষাবিদদের মত
শিক্ষাক্ষেত্রে মাতৃভাষার উপযোগিতা বোঝাতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে বহু মনীষী তাঁদের মূল্যবান মতামত তুলে ধরেছেন।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর ‘বঙ্গভাষা’ কবিতায় মাতৃভাষার প্রশংসা করে বলেছেন, ‘হে বঙ্গ ভান্ডারে তব বিবিধ রতন’। এছাড়াও তিনি বলেছেন, “There is nothing like cultivating and enriching our mother tongue … our Bengali is a very beautiful Language, it only wants men of genious to polish.”
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “বিষয় অনুসারেই রচনার ভাষার উচ্চতা বা সামান্যতা নির্ধারিত হওয়া উচিত। রচনার প্রধান গুণ এবং প্রথম প্রয়োজন, সরলতা এবং স্পষ্টতা।… অর্থগৌরব থাকিলে তাহাই সর্বোৎকৃষ্ট রচনা। তাহার পর ভাষার সৌন্দর্য, সরলতা এবং স্পষ্টতার সহিত সৌন্দর্য মিশাইতে হইবে।”
স্বামী বিবেকানন্দ চলিত ভাষার উপর জোর দিয়ে বলেছেন, “চলিতভাষায় কি আর শিল্পনৈপুণ্য হয় না? স্বাভাবিক ভাষা ছেড়ে একটা অস্বাভাবিক ভাষা তয়ের করে কি হবে? যে ভাষায় ঘরে কথা কও, তাতেই তো সমস্ত পাণ্ডিত্য গবেষণা মনে মনে কর,… যে ভাষায় নিজের মনে দর্শন-বিজ্ঞান চিন্তা কর, দশজনে বিচার কর-সে ভাষা কি দর্শন-বিজ্ঞান লেখবার ভাষা নয়? যদি না হয় তো নিজের মনে এবং পাঁচজনে ও সকল এই বিচার কেমন করে কর? স্বাভাবিক যে ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ আমরা করি, যে ভাষায় ক্রোধ, দুঃখ, ভালোবাসা ইত্যাদি জানাই, তার চেয়ে উপযুক্ত ভাষা হতেই পারে না; সেই ভাব, সেই ভঙ্গি, সেই সমস্ত ব্যবহার করে যেতে হবে।”
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘মাতৃভাষা ও সাহিত্য’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, “আজ আমি এই কথাটাই আপনাদিগকে বিশেষ করিয়া স্মরণ করাইতে চাই, যে, যথার্থ স্বাধীন ও মৌলিক চিন্তার সাক্ষাৎ মাতৃভাষা ভিন্ন ঘটে না, যথার্থ বড়ো চিন্তার ফল সংগ্রহ করিবার পথ মাতৃগৃহদ্বারের ভিতর দিয়াই …।” তিনি আরও বলেন, “ভাব ও চিন্তা যেমন ভাষার জন্মদান করে ভাষাও তেমনি চিন্তাকে নিয়ন্ত্রিত, সুসম্বদ্ধ ও শৃঙ্খলিত করে। … ভাষা ছাড়া সুসম্বদ্ধ চিন্তাও হয় না … তাহা হইলে এই দাঁড়ায় বাঙ্গালী বাংলা ছাড়া চিন্তা করিতে পারে না, ইংরাজ ইংরাজি ছাড়া ভাবিতে পারে না। তাদের পক্ষে মাতৃভাষা ভিন্ন যথার্থ চিন্তা যেমন অসম্ভব, বাঙ্গালীর পক্ষেও তেমনি। তা তিনি যত বড়ো ইংরাজি-জানা মানুষই হউন। বাংলা ভাষা ছাড়া স্বাধীন, মৌলিক বড় চিন্তা কোনো মতেই সম্ভব হইবে না।”
মাইকেল মধুসূদন দত্ত মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রমথনাথ বিশীকে (অনুবাদ অনুযায়ী) বলেছিলেন, “আমাদের বাংলা অতি সুন্দর ভাষা; প্রতিভাবানদের হাতে পড়িলে ইহার উজ্জ্বলতা বাড়িবে। আমাদের শৈশবের শিক্ষার ত্রুটির জন্য এ ভাষা শিখি নাই। বাংলার মধ্যে মহাভাষার উপাদান আছে। আমার সাধ হয় যে মাতৃভাষার চর্চায় জীবন নিয়োগ করি।” তিনি অন্য একটি পত্রে লিখেছিলেন, “I hope to familiarize my educated friends with these languages through the medium of our own tongue.”
পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মন্তব্য করেছেন, “যাঁহারা বাংলা গ্রন্থ লিখিয়াছেন তাঁহারা ভালো বাংলা শিখেন নাই। লিখিত বাংলা ও কথিত বাংলা এত তফাত হইয়া পড়িয়াছে যে, দুইটিকে এক ভাষা বলিয়া বোধ হয় না। দেশের অধিকাংশ লোকেই লিখিত ভাষা বুঝিতে পারে না। এজন্যই সাধারণ লোকের মধ্যে আজও পাঠকের সংখ্যা এত অল্প।… গ্রন্থকারেরা বাংলা ভাষা না শিখিয়া বাংলা লিখিতে বসিয়া এবং চলিত শব্দ সকল পরিত্যাগ করিয়া অপ্রচলিত শব্দের আশ্রয় লইয়া ভাষার যে অপকার করিয়াছেন তাহার প্রতিকার করা শক্ত।”
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু একটি পত্রে (৭. ৫. ২৬) লিখেছিলেন, “জেনে আনন্দিত হলাম যে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ম্যাট্রিক ক্লাস পর্যন্ত বাংলা ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম করেছে। আমাদের চাইতে, বর্তমান ও ভবিষ্যতের ছাত্রদের বাংলা সাহিত্যে আরও গভীর মনোনিবেশ করা উচিত। আমার শিক্ষায় যাকে আমি খুঁত বলে মনে করি তা হল বাংলা সাহিত্যে আমার বিশাল অজ্ঞতা এবং কেবলমাত্র এখনই আমি সেই অভাব পূরণের চেষ্টা করছি।”
রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী বলেন, “যাঁহারা আশা করিয়া নিশ্চিন্তে আছেন যে বাঙালী জনসাধারণ এককালে ইংরেজিতে পণ্ডিত হইয়া উঠিবে, তখন আর বাংলা ভাষায় কোনো বৈজ্ঞানিক সাহিত্য প্রণয়নের আবশ্যকতা থাকিবে না, তাঁহাদের কথা স্বতন্ত্র। আমার সে আশা নাই। বাংলার জনসাধারণ মাতৃভাষা ত্যাগ করিয়া ইংরেজি ধরুক, সে আকাঙক্ষা আমার মনে প্রবেশ করিতেও পারে না। বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ইংরেজির স্থানে বাঙ্গালা আসিয়া বসিবে, আমি বরং সেই দিনের আশা রাখি।”
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, “মাতৃভাষায় শিক্ষা হইলে, আমাদের এখন লাভ হইবে-সাধারণ ছেলেদের পক্ষে জ্ঞান অর্জনের পথ সহজ হইবে, অল্পেই ছেলেদের বুদ্ধি খুলিবে। মাতৃভাষার মধ্য দিয়া শিক্ষায় কোনো ফাঁকি চলিবে না।… তাহাদের চিন্তাপ্রণালী মার্জিত হইবে, শিক্ষার আনন্দ তাহারা পাইবে; শিক্ষা তাহারা সম্পূর্ণরূপে আত্মসাৎ করিতে পারিবে, শিক্ষা সত্যসত্যই তাহাদের মনের খোরাক জোগাইবে।”
বিভিন্ন কমিশন ও মাতৃভাষা (Education Commissions on Mother Tongue)
১। উড-এর ডেসপ্যাচ (Wood’s Despatch): মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার দাবি জোরালো হলে এতে বলা হয়, “We look therefore, to English language and to the vernacular language of India together as the media for the diffusion of European Knowledge…”
২। হান্টার কমিশন (১৮৮২-৮৩): প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষার স্বীকৃতি দিয়ে বলা হয়, “Primary Education be regarded as the instruction of the Masses through the vernacular …”
লর্ড কার্জন বলেছিলেন, “English has no place and should have no place in the scheme of primary education. Govt. Resolution 1904.” মাধ্যমিক স্তরের জন্য তিনি বলেন, “No scholar in a Secondary School should even them to allowed to abandon the study of vernacular.”
৩। স্যাডলার কমিশন (১৯১৭-১৯১৯): এই কমিশন সুপারিশ করে, “The Mother tongue ought to be given a place as the medium of instruction throughout the high school stage.”
স্বাধীনতা পর্বের কমিশন:
- (ক) ড. রাধাকৃষ্ণণ কমিশন (১৯৪৮-৪৯): উচ্চতর স্তরেও মাতৃভাষার পক্ষে মত দিয়ে বলা হয়, “For the medium of instruction for higher education English be replaced as early as practicable by an Indian language…” এবং “It is educationally unsound to make a Foreign tongue the means of acquiring knowledge.”
- (খ) মুদালিয়ার কমিশন (১৯৫২-৫৩): শিক্ষার সর্বস্তরে মাতৃভাষাকে মাধ্যম করার সুপারিশ করে বলা হয়, “Mother tongue or the regional language should generally be the medium of instruction throughout the Secondary stage….” এবং “Mother tongue or regional language would have been the medium of instruction at all stages of the Educational ladder.”
- (গ) কোঠারি কমিশন (১৯৬৪-৬৬): ত্রিভাষা সূত্র (Three-Language formula) মেনে নিয়ে তারা সুপারিশ করে: ১। নিম্ন প্রাথমিক স্তরে শুধু মাতৃভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা। ২। নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে (i) মাতৃভাষা, (ii) ইংরেজি বা হিন্দি ও (iii) অন্য একটি আধুনিক ভারতীয় বা ইউরোপীয় ভাষা। ৩। উচ্চমাধ্যমিক স্তরে মাতৃভাষা এবং উল্লিখিত অন্য ভাষাগুলির মধ্যে যেকোনো একটি।

