18th BRICS Summit 2026: বিশ্ব রাজনীতির ভরকেন্দ্র এখন ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লি। প্রগতি ময়দানের ‘ভারত মণ্ডপম’-এ আয়োজিত হচ্ছে ১৮তম ব্রিকস (BRICS) সম্মেলন ২০২৬। একদিকে দীর্ঘ সাত বছর পর ভারতে পা রাখলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, অন্যদিকে পশ্চিমা রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দিল্লিতে হাজির রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। সম্প্রসারিত ব্রিকসের ১১টি দেশের এই মেগা সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বলিষ্ঠ বার্তা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, একমেরু বিশ্বের দিন শেষ। কীভাবে ভারত বিশ্ব কূটনীতিতে মাস্টারস্ট্রোক দিল? বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত রাষ্ট্রনেতাদের আসল বক্তব্য এবং ব্রিকস সম্মেলন ২০২৬-এর সমস্ত খুঁটিনাটি নিয়ে রইল এই বিশেষ এবং তথ্যবহুল প্রতিবেদন।
18th BRICS Summit 2026 New Delhi: বিশ্বমঞ্চে ভারতের মেগা মাস্টারস্ট্রোক
আজ ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬। আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে দিনটি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। ভারতের সভাপতিত্বে নতুন দিল্লিতে আয়োজিত হচ্ছে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন। বর্তমান বিশ্বের টালমাটাল পরিস্থিতি—রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনা এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে পশ্চিমা আধিপত্যের পতন—এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এই সম্মেলন অভাবনীয় তাৎপর্য বহন করছে।
ব্রিকস আজ আর কেবল ৫টি দেশের (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা) জোট নয়। ইরান, মিশর, ইথিওপিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং ইন্দোনেশিয়াকে নিয়ে এটি এখন ১১টি শক্তিশালী দেশের এক মহাজোট, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক এবং গ্লোবাল জিডিপির ৪০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করছে। এই বারের থিম হলো—“Building for Resilience, Innovation, Cooperation and Sustainability”।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঐতিহাসিক ভাষণ: ‘রুল-টেকার’ থেকে ‘রুল-শেপার’
আজ ১২ সেপ্টেম্বর মূল প্লেনারি সেশনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গ্লোবাল সাউথের (উন্নয়নশীল দেশগুলোর) হয়ে যে জোরালো সওয়াল করেছেন, তা সারা বিশ্বের নজর কেড়েছে।
নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্য (Quote 1):
“While strengthening BRICS, we must also chart a course for global reform. The current structure of global governance resembles a pyramid: power and decision-making are concentrated at the top, while the lower tiers consist of nations that are affected by these decisions yet unable to shape them…”
(ব্রিকসকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি আমাদের বৈশ্বিক সংস্কারের পথও প্রশস্ত করতে হবে। বর্তমান বৈশ্বিক কাঠামোর রূপ একটি পিরামিডের মতো: ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার শীর্ষে কেন্দ্রীভূত, আর নিচের স্তরে রয়েছে সেই দেশগুলো যারা এই সিদ্ধান্তের দ্বারা প্রভাবিত হয় অথচ সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না…)
নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্য (Quote 2):
“Today, the Global South stands in the front row of global crises but in the back row of decision-making. We must transform this ‘pyramid of privilege’ into a ‘platform of partnership’…”
(আজ গ্লোবাল সাউথ বৈশ্বিক সঙ্কটের প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা পিছনের সারিতে। আমাদের অবশ্যই এই ‘সুবিধার পিরামিড’-কে ‘অংশীদারিত্বের প্ল্যাটফর্মে’ রূপান্তরিত করতে হবে…)
- উৎস (Source): WION News এবং Hindustan Times (১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদন)।
- কখন ও কোথায় বলেছেন: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দিল্লির ভারত মণ্ডপমে ব্রিকস সম্মেলনের লিডারস সেশনে (Leaders’ Session)।
- কেন বলেছেন: জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের (IMF) মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা দেশগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে। মোদী এই ভাষণের মাধ্যমে দাবি করেছেন যে, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আর কেবল অন্যের তৈরি নিয়ম মেনে চললে (Rule-takers) হবে না, তাদের নিজেদের নিয়ম তৈরি করার (Rule-shapers) অধিকার দিতে হবে।
ভ্লাদিমির পুতিনের কড়া বার্তা: পশ্চিমাদের ‘কদর্য’ অর্থনৈতিক যুদ্ধ
পশ্চিমা দেশগুলোর নানাবিধ নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভারতে এসেছেন। তিনি ১১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার ব্রিকস বিজনেস ফোরামে দাঁড়িয়ে জি-৭ (G7) ভুক্ত পশ্চিমা দেশগুলোর চরম সমালোচনা করেন।
ভ্লাদিমির পুতিনের বক্তব্য (Quote):
“Western competitors are doing everything to get back their erstwhile competitive edge, and sometimes this competition is taking some ugly forms… Right now, the world is undergoing structural, deep, profound shifts. It is explained by the fact that the so-called old leaders, which used to be the vanguard of economic growth in the second half of the 20th century, are being replaced by new engines of growth.”
(পশ্চিমা প্রতিযোগীরা তাদের হারানো প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ফিরে পেতে সবকিছু করছে, এবং অনেক সময় এই প্রতিযোগিতা অত্যন্ত কদর্য রূপ নিচ্ছে… এই মুহূর্তে বিশ্ব একটি কাঠামোগত এবং গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে যারা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তথাকথিত ‘পুরনো নেতা’ ছিল, আজ তাদের জায়গা নিচ্ছে নতুন প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিনগুলো।)
- উৎস (Source): The Economic Times (১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদন: “Putin slams West’s ‘ugly’ economic warfare”).
- কখন ও কোথায় বলেছেন: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ব্রিকস বিজনেস ফোরামের (BRICS Business Forum) ভাষণে।
- কেন বলেছেন: ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার ওপর যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে, পুতিন তার তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। তিনি স্পষ্ট তথ্যের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে ব্রিকস দেশগুলো এখন বিশ্ব জিডিপির ৪০% এর বেশি দখল করে আছে, যা জি-৭ দেশগুলোর (২৯%) চেয়ে অনেক বেশি।
৭ বছর পর ভারতে শি জিনপিং: ভারত-চীন সম্পর্ক কি স্বাভাবিক হবে?
২০১৯ সালের পর এই প্রথম ভারতে এলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্ক একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। তবে ১২ সেপ্টেম্বর বিকেল ৬টায় নরেন্দ্র মোদী এবং শি জিনপিংয়ের মধ্যে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
চীনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র এবং ভারতের অবস্থান থেকে যা উঠে এসেছে তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ:
শি জিনপিংয়ের দৃষ্টিভঙ্গি (চীনের বিদেশ মন্ত্রকের মতে):
“China attaches great importance to and actively participates in Brics cooperation, and supports India, the current chair, in successfully hosting this year’s Brics summit.”
(চীন ব্রিকস সহযোগিতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং এতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে, এবং বর্তমান চেয়ার হিসেবে ভারতকে এই বছরের ব্রিকস সম্মেলন সফলভাবে আয়োজনে পূর্ণ সমর্থন করে।)
সম্মেলনে শি জিনপিং ব্রিকসকে “শান্তি, উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক সংস্কারের অগ্রদূত” (Pioneer in innovation, peace, global governance) হওয়ার আহ্বান জানান।
নরেন্দ্র মোদীর কড়া বার্তা (PM Modi to Xi Jinping):
প্রধানমন্ত্রী মোদী স্পষ্টভাবে জানান যে, “Border peace is ‘essential’ for ties… both sides must honour existing pacts.” (সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার জন্য সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা অপরিহার্য… উভয় পক্ষকেই বিদ্যমান চুক্তিগুলো সম্মান করতে হবে।)
- উৎস (Source): The Times of India (১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ লাইভ ব্লগ এবং চীনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র মাও নিং-এর এক্স হ্যান্ডেল)।
- কখন ও কোথায় বলেছেন: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দ্বিপাক্ষিক বৈঠক এবং প্লেনারি সেশনে।
- কেন বলেছেন: চীন একদিকে ব্রিকসকে ব্যবহার করে আমেরিকার আধিপত্য খর্ব করতে চাইছে, অন্যদিকে ভারত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে সীমান্তে (Line of Actual Control) পূর্ণ শান্তি প্রতিষ্ঠা না হলে ভারতের বাজার চীনের জন্য সহজে উন্মুক্ত হবে না।
অন্যান্য বিশ্বনেতাদের দৃষ্টিভঙ্গি: ডলারের বিকল্প ব্যবস্থার দাবি
ব্রিকসের মঞ্চে নতুন সদস্য দেশগুলোর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং মার্কিন ডলারের আধিপত্য কমানো নিয়ে ইরান অত্যন্ত জোরালো বক্তব্য রেখেছে।
ইরানের বিদেশ মন্ত্রী আব্বাস আরাগচি-র (Abbas Araghchi) বক্তব্য:
“Inside BRICS, there are different opinions, but all members of the group believe that national currencies should be strengthened and trade between the member states should be conducted through national currencies.”
(ব্রিকসের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মতামত থাকতে পারে, কিন্তু এই গোষ্ঠীর সমস্ত সদস্য বিশ্বাস করে যে জাতীয় মুদ্রাগুলোকে শক্তিশালী করা উচিত এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাণিজ্য জাতীয় মুদ্রার মাধ্যমেই পরিচালিত হওয়া উচিত।)
- উৎস (Source): LiveMint (১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত লাইভ আপডেট)।
- কেন বলেছেন: ইরানের ওপর আমেরিকার কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থাকায়, তারা ব্রিকস দেশগুলোর নিজস্ব পেমেন্ট সিস্টেম এবং স্থানীয় মুদ্রায় (Local Currency) বাণিজ্যের ওপর জোর দিচ্ছে, যাতে আন্তর্জাতিক লেনদেনে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়।
নতুন দিল্লি ঘোষণাপত্র ২০২৬ (New Delhi Declaration) ও সন্ত্রাসবাদ দমন
এই সম্মেলনের অন্যতম বড় সাফল্য হলো ‘নতুন দিল্লি ঘোষণাপত্র’। এই ঘোষণাপত্রে স্পষ্টভাবে সব ধরনের আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদের তীব্র নিন্দা করা হয়েছে।
- পহেলগাম হামলার নিন্দা: ২৫ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে কাশ্মীরের পহেলগামে হওয়া ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হয়েছিলেন। ব্রিকস ঘোষণাপত্রে এই ঘটনার সুস্পষ্ট নিন্দা করে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসীদের এবং তাদের মদতদাতাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে।
- মধ্যপ্রাচ্য সংকট: ঘোষণাপত্রে ইসরায়েল ও অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ এলাকায় “সর্বোচ্চ সংযম” (Maximum Restraint) প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে এবং কূটনীতি ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজার কথা বলা হয়েছে।
উপসংহার: বহুমেরু বিশ্বের নতুন স্থপতি
২০২৬ সালের এই ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন (18th BRICS Summit) বিশ্বের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। একদিকে আমেরিকার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে কোয়াড (QUAD)-এ অংশীদারিত্ব, অন্যদিকে ব্রিকসের মঞ্চে রাশিয়া ও চীনের মতো দেশগুলোর সাথে সমান তালে নেতৃত্ব দেওয়া—এই অসামান্য “কৌশলগত ভারসাম্য” ভারত ছাড়া আর কারো পক্ষে সম্ভব নয়।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণের সেই বিখ্যাত লাইনটি—“Pyramid of privilege into a platform of partnership”—প্রমাণ করে যে ভারত আজ শুধু গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বর নয়, বরং এক নতুন বহুমেরু বিশ্বের (Multipolar World) প্রধান স্থপতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

