দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পশ্চিমা দেশগুলোর মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্য এবং ‘সিভিলাইজেশন ন্যারেটিভ’-এর কীভাবে অবসান ঘটছে তার এক নিবিড় বিশ্লেষণ। ‘India’s Assertive Geopolitics and the End of Western Dominance’-এর ওপর ভর করে নিজস্ব অর্থনীতি, সামরিক শক্তি ও যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে ভারত কীভাবে এক শক্তিশালী পরাশক্তি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে শ্রেষ্ঠ আসন গ্রহণ করছে, তার বিস্তারিত ও চাঞ্চল্যকর তথ্য জানুন এই প্রতিবেদনে।

Table of Contents
১. ক্ষমতার পালাবদল এবং বিশ্বমঞ্চে উদীয়মান ভারত
বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে বিশ্ব রাজনীতি এবং অর্থনীতির ভরকেন্দ্র ছিল মূলত পশ্চিমা দেশগুলো। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বিশাল পালাবদল ঘটতে চলেছে। একসময়ের একক আধিপত্য বিস্তারকারী পশ্চিমা দেশগুলোর ক্ষমতা যে ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে এবং এশিয়া, বিশেষ করে ভারতবর্ষ যে বিশ্বমঞ্চের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসছে, তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এই পরিবর্তনের মূলে রয়েছে ভারতের সুপরিকল্পিত কৌশল, যাকে আন্তর্জাতিক স্তরে India’s Assertive Geopolitics and the End of Western Dominance বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববাসী দেখে এসেছে যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মুষ্টিমেয় কয়েকটি দেশের কথাই শেষ কথা বলে বিবেচিত হতো। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাদের ইচ্ছামতো চলতে বাধ্য করা হতো। কিন্তু একুশ শতকের এই পর্যায়ে এসে সেই পুরনো সমীকরণ আর কাজ করছে না। ভারত এখন আর কোনো পরাশক্তির ছায়ায় থাকতে রাজি নয়, বরং নিজেই এক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার জন্য প্রস্তুত। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের বর্তমান প্রতিনিধিরা আর নীরব শ্রোতা হয়ে বসে থাকছেন না; তারা পাল্টা প্রশ্ন করছেন, যুক্তি দিচ্ছেন এবং পশ্চিমা বিশ্বের তৈরি করা দীর্ঘদিনের ভ্রান্ত আখ্যানগুলোকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছেন। এই উদীয়মান ভারতের আত্মবিশ্বাস এবং বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠত্বের আসন ছিনিয়ে নেওয়ার যে প্রস্তুতি চলছে, তা আজ সমগ্র বিশ্বের কাছে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
২. পশ্চিমী সভ্যতার অহংকার: এক শেষ হতে চলা আধিপত্যের আখ্যান
পশ্চিমা দেশগুলোর (ইউরোপ ও আমেরিকা) মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে একটি অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক দিক লক্ষ্য করা যায়, যেখানে তারা নিজেদেরকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা বলে মনে করে। এই অহংকারের ভিত্তি এবং তার বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণ করলে এক চমকপ্রদ সত্য উঠে আসে।
ক. উপনিবেশবাদ থেকে অর্থনীতি: পশ্চিমাদের সমৃদ্ধির পেছনের কালো ইতিহাস
পশ্চিমা দেশগুলোর আজকের এই বিপুল অর্থনৈতিক প্রাচুর্য তাদের নিজেদের ভূখণ্ডে তৈরি হয়নি। ফরাসি, ডাচ, পর্তুগিজ বা ইংরেজ—যাই হোক না কেন, তারা পূর্বের দেশগুলো থেকে কাঁচামাল এবং সম্পদ লুট করে নিজেদের উপনিবেশ তৈরি করেছিল। গত ২০০ বছর ধরে এই সম্পদ লুটের মাধ্যমেই তারা বর্তমানের ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ভারত বা অন্যান্য এশীয় ও আফ্রিকান দেশগুলোর সম্পদ কাজে লাগিয়ে তারা নিজেদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে এবং আজ সেই অর্থনৈতিক শক্তির অহংকারে তারা বাকি বিশ্বকে নিচু চোখে দেখে।
খ. বর্তমানে তারা বুঝতে পারছে না তাদের দিন শেষ
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং মূলত সাদা চামড়ার অধিকারী হওয়ার কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে একটি উচ্চমন্যতা বা ইগো (Ego) কাজ করে। তারা নিজেদেরকে পৃথিবীর একটি উচ্চপর্যায়ের প্রাণী বলে মনে করে এবং পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে বসবাসকারীদের নিচু পর্যায়ে রাখে। এই মানসিকতা থেকে তারা একটি অলিখিত নিয়ম বা Civilization Narrative তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে তারা সারা পৃথিবীকে লেকচার দেওয়া শুরু করে। আফ্রিকা বা এশিয়ার দেশগুলোকে তারা জ্ঞান দেয় এবং এমন একটি ভাব দেখায় যেন পশ্চিমা দেশগুলো কোনো সমস্যাই তৈরি করেনি, সব সমস্যা থার্ড ওয়ার্ল্ড কান্ট্রি বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর দ্বারাই সৃষ্টি। এটি মূলত একটি Power Game, যার মাধ্যমে তারা মানুষের অবচেতন মনে ঢুকিয়ে দিয়েছে যে “ওয়েস্ট” মানেই সবদিক থেকে ভালো। কিন্তু তারা বুঝতে পারছে না যে, India’s Assertive Geopolitics and the End of Western Dominance-এর ধাক্কায় তাদের এই আধিপত্যের দিন আজ শেষ হতে চলেছে।
৩. পরাশক্তি হওয়ার পথে ভারতের সুপরিকল্পিত ত্রিমুখী কৌশল
ভারত খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে যে, বিশ্বমঞ্চে একটি “সুপারপাওয়ার” বা পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে হলে কেবল আবেগ বা ফাঁকা বুলি দিয়ে কাজ হবে না। এর জন্য বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে মূলত তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে।
ক. শক্তিশালী অর্থনীতি: সম্মানের প্রথম শর্ত
ভারত বুঝেছে যে কোনো গরিব দেশ সুপারপাওয়ার হতে পারে না। পরাশক্তি হতে গেলে দেশকে আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ হতে হবে, বড়লোক হতে হবে। বাস্তব জীবনে যেমন কোনো অনুষ্ঠানে অনেক আত্মীয়ের মধ্যে যে আত্মীয় তুলনামূলকভাবে বেশি ধনী, তাকে বাড়তি খাতির যত্ন করা হয় বা চেয়ার এগিয়ে দেওয়া হয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও নিয়মটি ঠিক একই। গরিব দেশ যতই জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা বলুক না কেন, সুপারপাওয়ার হিসেবে তাকে কেউ মানবে না। তাই ভারত তার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছে।
খ. নিশ্ছিদ্র সামরিক শক্তি: সুরক্ষার গ্যারান্টি
কেবল অর্থনীতি নয়, একটি দুর্বল রাষ্ট্রকে কেউ সুপারপাওয়ার হিসেবে মেনে নেবে না। সেই রাষ্ট্রই সুপারপাওয়ার হবে, যে নিজেকে রক্ষা করতে পারে এবং বিপদের দিনে অন্যকে রক্ষা করতে পারে। সমাজে যেমন কোনো ব্যক্তি যদি পুলিশে চাকরি করে, তবে সে হয়তো খুব বেশি ধনী না হলেও তার একটা পাওয়ার বা ক্ষমতা থাকে বলে মানুষ তাকে খাতির করে; কারণ সে বিপদের সময় রক্ষা করতে পারবে। ঠিক তেমনি ভূ-রাজনীতিতেও সামরিক শক্তি অত্যন্ত জরুরি। এই কারণেই ভারত সামরিক দিক থেকে নিজেকে নিশ্ছিদ্র ও শক্তিশালী করে তুলছে।
গ. নিজস্ব কণ্ঠস্বর: বিশ্বমঞ্চে নিজস্ব আখ্যান তৈরি
অর্থনীতি এবং সামরিক শক্তির পাশাপাশি ভারতের নিজস্ব একটি দৃঢ় কণ্ঠস্বর থাকা বাঞ্ছনীয়। নিজস্ব কোনো Narrative না থাকলে এবং সেটি সারা পৃথিবীর কাছে পৌঁছে দিতে না পারলে, বিশ্ব সমাজ আপনাকে মানবে না। সমাজে যেমন কিছু মানুষ আছেন যারা খুব বড়লোক নন বা পুলিশেও চাকরি করেন না, কিন্তু তাদের কথাবার্তার যুক্তি ও মারপ্যাঁচ এত প্রখর যে জমিজমা বা সম্পত্তির ভাগ-বাঁটোয়ারার সময় মানুষ তাদের ডেকে পাঠায়। ঠিক একইভাবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও নিজস্ব কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করতে হবে।
৪. ভারতের দৃঢ় ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান (Assertive Geopolitics) ও পাল্টা আঘাত
গত কয়েক বছর ধরে ভারত যে Assertive Geopolitics বা দৃঢ় ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছে, তা গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে।
ক. মেরুকরণের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান: “ভারত কেবল ভারতের দিকে”
আগে আন্তর্জাতিক নিয়ম ছিল যে আমেরিকা বা ইউরোপ একদিকে এবং রাশিয়া অন্যদিকে থাকলে যেকোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে হবে। কিন্তু ২০২১-২২ সালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সময় থেকে ভারত অত্যন্ত সুকৌশলে এই নিয়ম ভেঙে দিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডঃ এস জয়শঙ্কর বারবার বিভিন্ন মঞ্চে স্পষ্ট করেছেন যে, পৃথিবীতে কেবল দুটি দিকই নেই; ভারত ইউরোপ বা রাশিয়া—কারো দিকেই নেই, ভারত কেবল ভারতের দিকে রয়েছে। ভারত নিজেদের ক্লাব বা নিজস্ব অবস্থান নিজেরাই তৈরি করে নিয়েছে। এটি India’s Assertive Geopolitics and the End of Western Dominance-এর একটি অন্যতম প্রধান উদাহরণ।
খ. পশ্চিমাদের ভণ্ডামির মুখোশ খুলে দেওয়া: তথ্যের ভিত্তিতে পাল্টা যুক্তি (Counter Narrative)
আগে পশ্চিমা দেশগুলো যা বলত, বাকি বিশ্ব সেটাই মেনে নিত। কিন্তু বর্তমানে ভারত “কাউন্টার ন্যারেটিভ” বা পাল্টা যুক্তি স্থাপন করছে এবং চোখে চোখ রেখে কথা বলছে। যখন পশ্চিমা সাংবাদিকরা ভারতের রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেটা (Data) বা তথ্য দিয়ে প্রমাণ করে দেন যে ইউরোপ অর্ধেক বেলায় রাশিয়া থেকে যে পরিমাণ শক্তি আমদানি করে, ভারত সারা মাসেও তা করে না। ইউরোপিয়ান সাংবাদিকদের এই ধরনের তথ্যের মুখোমুখি হওয়ার অভ্যাস ছিল না। ভারতের এই দৃঢ় অবস্থানের ফলে সারা পৃথিবীর মানুষের অবচেতন মনে একটি সাইকোলজিক্যাল পরিবর্তন আসছে এবং তারা বুঝতে পারছে যে পশ্চিমাদের সব কথাই ধ্রুব সত্য নয়।
৫. যোগ্য নেতৃত্ব: ভারতের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য নীতির নেতৃত্বে ‘টেকনোক্র্যাট’ বা বিশেষজ্ঞরা
ভারত সরকার উপলব্ধি করেছে যে বিশ্বমঞ্চের এই চরম স্নায়ুযুদ্ধে এবং কূটনৈতিক লড়াইয়ে জিততে হলে কেবল ভোটের ময়দানে জনপ্রিয় জননেতা দিয়ে কাজ হবে না।
ভোটে জেতার জন্য এমন নেতার প্রয়োজন হয় যিনি মানুষের মধ্যে পপুলার বা জনপ্রিয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক স্তরে দেশের হয়ে কথা বলার জন্য নির্দিষ্ট বিষয়ে অগাধ জ্ঞান, পড়াশোনা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের (Technocrats) প্রয়োজন, যাদের “এক্সপোজার” বা বৈশ্বিক ধারণা রয়েছে।
- ডঃ এস জয়শঙ্কর: ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো সাধারণ জননেতা নন, তিনি ৪১ বছর ধরে ভারতের ডিপ্লোম্যাট বা কূটনীতিক হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর কাছে কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়, বাস্তব বিশ্বের প্র্যাকটিক্যাল নলেজ রয়েছে।
- অশ্বিনী বৈষ্ণব: রেল ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী একজন আইএএস (IAS) অফিসার এবং এমবিএ (MBA) করা একজন টেকনোক্র্যাট।
- পীযূষ গোয়েল: বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রী একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (Chartered Accountant) এবং সারা ভারতে দ্বিতীয় স্থান (All India Rank 2) অধিকার করেছিলেন। তিনি আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কার (Investment Banker) হিসেবে কাজ করেছেন এবং স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (SBI) ও ব্যাঙ্ক অফ বরোদার বোর্ডেও ছিলেন।
এই ধরনের যোগ্য ব্যক্তিদের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার ফলেই ভারত আজ বিশ্বমঞ্চে এতটা পরাক্রমশালী হয়ে উঠতে পেরেছে।
৬. বার্লিন গ্লোবাল ডায়লগ: পশ্চিমী অহংকারের কফিনে শেষ পেরেক
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর অহংকার কীভাবে ধূলিসাৎ হচ্ছে, তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো বার্লিন গ্লোবাল ডায়লগ (BGD)। সেখানে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল ইউরোপের মাটিতে বসেই ইউরোপিয়ানদের থোঁতা মুখ ভোঁতা করে দিয়েছেন।
আমেরিকার ট্রেড ডিল বা ইউরোপের এফটিএ (FTA) সম্পর্কে সমস্ত আইন ও আইনের মারপ্যাঁচ পীযূষ গোয়েল খুব ভালোভাবে বোঝেন। তাই যখন একটি প্যানেল ডিসকাশনে লাল পোশাক পরা এক ইউরোপিয়ান সঞ্চালিকা কোনো ডেটা ছাড়াই ভারতকে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আক্রমণ করার চেষ্টা করেন, তখন পীযূষ গোয়েল কোনো রকম আবেগ বা রাগ না দেখিয়ে সম্পূর্ণ ডেটা বা তথ্য দিয়ে তাদের চুপ করিয়ে দেন। তিনি স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেন যে “Problem caused by you” (সমস্যাটি আপনাদের দ্বারাই সৃষ্টি)। না জেনে, কোনো গবেষণা না করে ভারতের দিকে আঙুল তোলা যে পশ্চিমা দেশগুলোর একটি বদভ্যাসে পরিণত হয়েছে, তা তিনি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তুলে ধরেন। এটি India’s Assertive Geopolitics and the End of Western Dominance-এর একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
৭. পীযূষ গোয়েলের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার: চোখে চোখ রেখে লড়াই
বার্লিন গ্লোবাল ডায়লগের সেই ঐতিহাসিক মঞ্চে সঞ্চালিকা এবং ভারতের মন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের মধ্যে যে কথোপকথন হয়েছিল, তা নিচে বিশদে দেওয়া হলো:

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: জলবায়ু পরিবর্তন একটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। এটি কোনো সাধারণ ব্যাপার নয়।
পীযূষ গোয়েল: এই সমস্যার জন্য প্রাথমিকভাবে কে দায়ী? ওজোন স্তরটি কোথায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এত কার্বন কে সেখানে পাঠিয়েছে?
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আমরা সবাই।
পীযূষ গোয়েল: না, আমি দুঃখিত। আমি বিশ্বের জনসংখ্যার ১৭ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করি। অথচ সেখানে সঞ্চিত কার্বনে আমাদের অবদান ৩ শতাংশেরও কম। অন্যদিকে, আপনারা বিশ্বের জনসংখ্যার মাত্র ৩ বা ৪ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করেন। আর এই কার্বন নির্গমন বা সমস্যার ক্ষেত্রে আপনাদের অবদান…
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: ৬ শতাংশ।
পীযূষ গোয়েল: না, এটি ঐতিহাসিক। এটি সম্ভবত ২০ শতাংশের কাছাকাছি। সুতরাং এই সমস্যাটি আপনাদের দ্বারাই সৃষ্টি হয়েছে এবং তার পেছনে যথেষ্ট কারণও ছিল। আপনারা নিজেদের অর্থনীতিকে বড় করছিলেন। আপনারা স্বল্প খরচে কার্বন-ভিত্তিক শক্তি চেয়েছিলেন। আপনারা দিনের পর দিন কয়লা পুড়িয়েছেন যাতে আপনাদের শক্তির খরচ কম থাকে।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: কিন্তু শুধু ইউরোপ নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এর সাথে জড়িত।
পীযূষ গোয়েল: আমি এখানে “আপনারা” বলতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং পশ্চিমা দেশগুলোকে বোঝাচ্ছি। এটি একটি ন্যায্যতার যুক্তি। আজও মাথাপিছু কার্বন নির্গমনে আমার অবদান আপনাদের তুলনায় সম্ভবত ১০ বা ১৫ শতাংশের কম। ইউরোপে মাথাপিছু ওজোন স্তরের ক্ষতি বা কার্বন নির্গমনের পরিমাণ ভারতের একজন সাধারণ মানুষের তুলনায় ৭ বা ৮ গুণ বেশি।
আমি বিশ্বের ১৭ শতাংশ জনসংখ্যাকে সমর্থন করি এবং আমি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার অর্থনীতি সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন। আমাকে ১.৪ বিলিয়ন মানুষের খাদ্য ও শক্তির চাহিদা মেটাতে হবে এবং একটি জাতি হিসেবে সুরক্ষিত থাকতে হবে। তা সত্ত্বেও আমাদের কাছে দ্রুত বর্ধনশীল পরিচ্ছন্ন শক্তির (clean energy) প্রোগ্রাম রয়েছে। আমরা আমাদের ইস্পাত শিল্পকে পরিবেশবান্ধব করছি এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বৈশ্বিক প্রচেষ্টাকে সমর্থন করছি।
কিন্তু ২০১৫ সালে যখন প্যারিসে পুরো বিশ্ব একত্রিত হয়েছিল, তখন প্রধানমন্ত্রী মোদী গ্লোবাল সাউথকে (উন্নয়নশীল দেশগুলোকে) একত্রিত করে কপ-২১ (COP21) চুক্তিতে স্বাক্ষর করিয়েছিলেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে আমাদের দায়িত্ব হবে ‘সাধারণ কিন্তু পৃথক’ (common but differentiated responsibility)। এটি সম্মত হয়েছিল যে, যে সমস্ত উন্নত দেশগুলো দশকের পর দশক ধরে জলবায়ু নষ্ট করে নিজেদের সুবিধা ভোগ করেছে, তাদের একটি বড় মূল্য চোকাতে হবে। তারা উন্নয়নশীল এবং কম উন্নত দেশগুলোকে, দ্বীপরাষ্ট্রগুলোকে সমর্থন করবে। কিন্তু প্রতি বছর মাত্র ১০০ বিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। ১১ বছর কেটে যাওয়ার পরেও আমরা তার এক পয়সাও দেখতে পাইনি, সবই কেবল প্রতিশ্রুতি।
ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বা সিবিএএম (CBAM) কি এই ‘সাধারণ কিন্তু পৃথক দায়িত্ব’কে স্বীকৃতি দেয়? তারা কি এটা মেনে নেয় যে কম উন্নত দেশগুলোরও তাদের সন্তানদের, পরিবারকে এবং জনগণকে একটি উন্নত জীবনযাত্রা দেওয়ার অধিকার রয়েছে? ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এই বৃহত্তর প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা কম উন্নত দেশগুলোর ডিকার্বনাইজেশন প্রচেষ্টায় সাহায্য করতে ব্যর্থ হয়েছে। আপনারা যত বেশি নিয়ম নিজেদের ওপর চাপাবেন, এই ধরনের খরচ বহন করা তত বেশি কঠিন হয়ে পড়বে।
৮. জগত সভায় শ্রেষ্ঠ আসন নেওয়ার পথে ভারত
উপরোক্ত সমগ্র আলোচনা এবং ঘটনাপ্রবাহ থেকে একটি বিষয় সম্পূর্ণ পরিষ্কার যে, পশ্চিমা দেশগুলো যতই মোহ বা অস্বীকারের ঘেরাটোপে নিজেদের বন্দি রাখুক না কেন, তাদের একক ক্ষমতার সূর্য আজ অস্তমিত হওয়ার পথে। অর্থনীতি, সুদৃঢ় সামরিক শক্তি, বুদ্ধিদীপ্ত তথ্য-ভিত্তিক কূটনীতি এবং যোগ্য টেকনোক্র্যাট নেতৃত্বের ওপর ভর করে ভারত আজ সত্যি সত্যিই জগত সভায় তার হৃত গৌরব এবং শ্রেষ্ঠ আসনটি পুনরায় গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত। India’s Assertive Geopolitics and the End of Western Dominance কোনো কাল্পনিক তত্ত্ব নয়, এটি একুশ শতকের সবচেয়ে বড় বাস্তব, যার সাক্ষী থাকছে সমগ্র বিশ্ব। যারা এতদিন পৃথিবীর ভাগ্য নির্ধারণ করত, আজ তাদের সামনে দাঁড়িয়ে ভারত চোখে চোখ রেখে প্রমাণ করে দিচ্ছে—নতুন বিশ্বের নতুন নিয়ামক হিসেবে ভারতবর্ষের উত্থানকে আর কোনোভাবেই আটকে রাখা সম্ভব নয়।

