প্রাইমারি টেট (Primary TET) পরীক্ষার্থীদের জন্য শিশু মনস্তত্ত্ব ও শিক্ষাবিজ্ঞান বিষয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ‘শিক্ষার মনোবৈজ্ঞানিক ভিত্তি (Psychological bases of Education)’। মনোবিজ্ঞানের অর্থ, শিক্ষা ও মনোবিজ্ঞানের সম্পর্ক এবং আধুনিক শিক্ষায় নির্মিতিবাদ সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।
এই পোস্টটি পড়ে পরীক্ষার্থীদের কী উপকার হবে?
আসন্ন শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ‘শিশু মনস্তত্ত্ব ও শিক্ষাবিজ্ঞান’ (Child Psychology and Pedagogy) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্কোরিং বিষয়। এই পোস্টে আমরা “শিক্ষার মনোবৈজ্ঞানিক ভিত্তি” অধ্যায়টি সম্পূর্ণ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছি। এই লেখাটি মনযোগ দিয়ে পড়লে আপনারা মনোবিজ্ঞানের প্রাচীন ও আধুনিক ধারণা, শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন পদ্ধতি, নির্মিতিবাদ (Constructivism) এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের বৈচিত্র্য সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাবেন। এর ফলে পরীক্ষায় পেডাগজি সংক্রান্ত জটিল প্রশ্নগুলির সঠিক উত্তর নির্বাচন করা আপনাদের জন্য অনেক সহজ হবে।

মনোবিজ্ঞানের প্রাচীন ও আধুনিক অর্থ (Traditional & Modern Concept of Psychology)
মনোবিজ্ঞানের ইংরেজি প্রতিশব্দ হল Psychology। গ্রিক শব্দ Psyche ও Logos শব্দ থেকে Psychology শব্দটির উৎপত্তি। Psyche কথার অর্থ হল আত্মা (Soul) এবং Logos শব্দের অর্থ হল বিজ্ঞান (Science) অর্থাৎ আত্মার বিজ্ঞানই হল মনোবিজ্ঞান। মনোবিজ্ঞানের এই সংজ্ঞা অনেকের মনঃপুত হল না। তাঁদের মতে, আত্মা পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষণযোগ্য নয়, তাই এর প্রকৃত স্বরূপ জানা যায় না। আত্মা নিয়ে কোনো বিজ্ঞান গড়ে উঠতে পারে না। তাই একে ‘আত্মার বিজ্ঞান’ বলা যুক্তিযুক্ত নয়।
পরবর্তীকালে মনোবিজ্ঞান ‘মন’-এর বিজ্ঞান বলে চিহ্নিত হয়। মনোবিদ হফডিং (Hoffding) বলেন, মনোবিজ্ঞান হল মনের বিজ্ঞান (Psychology is the science of mind)। আত্মার বিজ্ঞান থেকে মনোবিজ্ঞান সংজ্ঞাটি অপেক্ষাকৃত বস্তুনিষ্ঠ হলেও সংজ্ঞাটি পরিত্যক্ত হয়।
অতঃপর মনোবিজ্ঞানকে ‘চেতনার বিজ্ঞান’ বলে ব্যাখ্যা করা হয়। মনোবিদ অ্যাঞ্জেল (Angell) বলেন, মনোবিজ্ঞান হল চেতনার বিজ্ঞান (Science of Consciousness)। লক, হিউম প্রমুখ দার্শনিকগণ এবং ভুন্ড (Wundt), টিচেনার (Titchener) প্রমুখ মনোবিদগণ মনোবিজ্ঞানকে চেতনা অনুশীলনকারী বিজ্ঞান হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন।
পরবর্তীকালে মনোবিজ্ঞানকে ‘আচরণের বিজ্ঞান’ বলে গণ্য করা হয়। Watson, Mc.Dougall, Woodworth প্রমুখ মনোবিজ্ঞানীগণ এই মতের সমর্থক, যদিও তাঁদের ব্যাখ্যার মধ্যে অনেক পার্থক্য দেখা যায়। মনোবিদ ওয়াটসন (Watson) বলেন, মনোবিজ্ঞান হল আচরণ সম্পর্কীয় বিজ্ঞান (Psychology is a science of behaviour)। মনোবিজ্ঞানকে যদি বিজ্ঞানের স্তরে উন্নীত করতে হয় তবে আত্মা, মন, চেতনা প্রভৃতি যে বস্তুগুলি ইন্দ্রিয়াতীত ও যেগুলি পরীক্ষাসাপেক্ষ নয় সেগুলিকে বাদ দেওয়া উচিত। আচরণ হল পরীক্ষাণযোগ্য। সুতরাং মনোবিজ্ঞানকে প্রাণীর আচরণের বিজ্ঞান বলাই যুক্তিযুক্ত।
পরবর্তীকালে মনোবিদ Mc. Dougall বলেন, ‘Psychology is the positive science of behaviour of living things.’ অর্থাৎ মনোবিজ্ঞান হল প্রাণীর আচরণের বিষয়নিষ্ঠ বিজ্ঞান। আধুনিক শিক্ষাবিদের মতে, শিক্ষার তত্ত্ব ও প্রয়োগ যেমন শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ, পাঠক্রম প্রণয়ন, শিক্ষা-শিখন প্রক্রিয়া, মূল্যায়ন এবং শিক্ষাব্যবস্থাপনায় মনোবিজ্ঞানের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আচরণবাদী মনোবিদ Woodworth বলেন, ‘Psychology is the science of activities in relation to his environment’। অর্থাৎ পারিপার্শ্বিকের প্রেক্ষিতে ক্রিয়াকলাপের বিজ্ঞান হল মনোবিজ্ঞান।
উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলি বিশ্লেষণ করে বলা যায়-
“মনোবিজ্ঞান জীবের আচরণ সম্বন্ধীয় বিষয়নিষ্ঠ বিজ্ঞান যা জীবের আচরণের ভিত্তিতে মানসিক প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ, শ্রেণিবিভাগ, গতিপ্রকৃতি, নিয়ম, কারণ ও পরিমাণ নির্ণয় ও ব্যাখ্যা করে এবং মানসিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন দেহগত প্রক্রিয়াগুলিকে ব্যাখ্যা করে”।
শিক্ষা ও মনোবিদ্যার মধ্যে পার্থক্য (Difference between Education & Psychology)
তবে একথাও সত্য যে শিক্ষা ও মনোবিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও শিক্ষা ও মনোবিজ্ঞান এক নয়। যেমন-
- (১) মনোবিজ্ঞান বিষয়নিষ্ঠ বিজ্ঞান। অপরদিকে শিক্ষা নিয়মনিষ্ঠ বিজ্ঞান।
- (২) কেবল মনোবিজ্ঞান নয়, শিক্ষা দর্শন, সমাজ ও অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
- (৩) মনোবিজ্ঞান একটি মৌলিক বিজ্ঞান, সেই অর্থে শিক্ষা মৌলিক বিজ্ঞান নয়।
- (৪) এই অর্থে মনোবিজ্ঞান হল শুদ্ধ বিজ্ঞান এবং শিক্ষা হল প্রয়োগিক বিজ্ঞান।
- (৫) দেশ, সমাজ, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি ভেদে শিক্ষার লক্ষ্য, পাঠক্রম, কর্মসূচি সবেরই পরিবর্তন দেখা যায়। মনোবিজ্ঞান স্থান, সমাজ, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি নিরপেক্ষ।
শিক্ষা-মনোবিজ্ঞান (Educational Psychology)
শিক্ষা-মনোবিজ্ঞান, ফলিত মনোবিজ্ঞানের একটি শাখা। শিক্ষাবিদ এবং মনোবিদগণ শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন। কয়েকটি সংজ্ঞার উল্লেখ করা হল-
- স্কিনার (Skinner): বলেছেন, “শিক্ষা-মনোবিজ্ঞান হল মনোবিজ্ঞানের সেই শাখা যা শিখন ও শিক্ষণ নিয়ে কাজ করে।”
- বার্নার্ড (Burnerd): মতে, “শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানের কাজ হল শিখন ও শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয়, বিশেষত বিদ্যালয়ের শিখন ও শিক্ষণ বিষয়ে আলোচনা করা।”
- ক্রো এবং ক্রো (Crow & Crow): মনে করেন, “শিক্ষা-মনোবিজ্ঞান কেবল শিক্ষার্থীর শিক্ষামূলক আচরণ অনুশীলন করে। বিষয়টি ব্যক্তির জন্ম থেকে পরিণত বয়স পর্যন্ত শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করে।”
- জাড (Judd): বলেছেন, “শিক্ষা-মনোবিজ্ঞান হল সেই বিজ্ঞান যা ব্যক্তিজীবনের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিকাশের বিভিন্ন স্তরের যে পরিবর্তন ঘটে তার বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করে।”
- পিল্ (Peel): মতে, “শিক্ষা-মনোবিজ্ঞান হল শিক্ষার বিজ্ঞান।”
শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের উপর একাধিক সংজ্ঞা আছে (স্কিনার, বার্নার্ড, ক্রো এবং ক্রো প্রমুখের) যার সঙ্গে উল্লেখযোগ্য হল মনোবিদ কোলেনসিক (Kolensik) সংজ্ঞা। তিনি মনে করেন, “শিক্ষাপ্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা ও উন্নত করতে মনোবিজ্ঞানের যেসব তথ্য ও নীতি সহায়ক, সেগুলির অনুশীলনই হল শিক্ষা-মনোবিজ্ঞান”। শিক্ষা-মনোবিদ্যা একটি ক্রমবর্ধমান জ্ঞানের বিষয় যার অনুশীলনের সীমারেখা ক্রমশ ব্যাপ্তি লাভ করছে। আধুনিক শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্রটি ক্রমশ জটিল হচ্ছে যা শিক্ষা পরিস্থিতিতে সমগ্র মানুষকে বিচার করে।
শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানের পদ্ধতি (Methods of Educational Psychology)
শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানের পদ্ধতিগুলি হল-
- ১. অন্তর্দর্শন (Intropection): অন্তর্দর্শন হল সর্বাপেক্ষা প্রাচীন পদ্ধতি যা প্রথমে দর্শনের উপর ও পরে মনস্তত্ত্বে ব্যবহৃত হয়। এর সাহায্যে ব্যক্তি তার চেতন মনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তথ্যসংগ্রহ করে।
- ২. পর্যবেক্ষণ (Observation): আক্ষরিক অর্থে পর্যবেক্ষণ হল বাইরে থেকে দেখা। প্রায় সমস্ত রকমের গবেষণার ক্ষেত্রে তথ্যসংগ্রহের জন্য পর্যবেক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক পদ্ধতি। ব্যক্তির বাহ্যিক আচরণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তথ্যসংগ্রহ করে ব্যক্তির অভ্যন্তরে যে মানসিক প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল তা অধ্যয়ন করাই হল এই পদ্ধতির উদ্দেশ্য।
- ৩. সাক্ষাৎকার (Interview): সাক্ষাৎকার হল একটি পদ্ধতি যেখানে সাক্ষাৎকারক কতাবার্তার মাধ্যমে ব্যক্তি সম্পর্কীয় নানাবিধ তথ্য সংগ্রহ করে তার মূল্যায়ন করে।
- ৪. ক্লিনিক্যাল পদ্ধতি (Clinical Method): প্রধানত অপসংগতিমূলক এবং স্বাভাবিক থেকে বিচ্যুত আচরণ সম্পর্কিত বিশদ তথ্যসংগ্রহের জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। ক্লিনিক্যাল পদ্ধতির উদ্দেশ্য হল ব্যক্তির সমস্যা চিহ্নিত করা, কারণ নির্ণয় করা এবং পরিবেশের সঙ্গে সঠিক অভিযোজনের জন্য চিকিৎসার সুপারিশ করা।
- ৫. সার্ভে পদ্ধতি (Survey Method): শিক্ষা-মনোবিদ্যার বিভিন্ন বিষয়ের উপর সমীক্ষার ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানমূলক সার্ভে পদ্ধতির ব্যবহার করা হয়।
- ৬. বিজ্ঞানভিত্তিক বা পরীক্ষণমূলক পদ্ধতি (Experimental Method): মানুষের আচরণকে নৈর্ব্যক্তিক এবং বিজ্ঞানভিত্তিক করে তোলার জন্য মনস্তত্ত্ববিদদের অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলেই পরীক্ষণমূলক পদ্ধতির বিকাশ ঘটে। আচরণবাদীদের একটি বড়ো অবদান হল পীরক্ষণমূলক পদ্ধতির সাহায্যে মানুষের আচরণ বোঝা, নিয়ন্ত্রণ করা এবং ভবিষ্যদ্বাণী করা।
শিক্ষা-মনোবিজ্ঞান একটি প্রয়োগমূলক বিজ্ঞান (Psychology is an Applied Science)
শিক্ষা-মনোবিজ্ঞান একটি প্রয়োগমূলক বিজ্ঞান, কারণ-
- (১) পরীক্ষণ পদ্ধতি: আধুনিক শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানে পরীক্ষণ পদ্ধতি বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হয়।
- (২) নীতি ও সূত্র গঠন করে: প্রয়োগমূলক বিজ্ঞানের যেমন কিছু সূত্র ও নীতি রয়েছে শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানের তেমনি প্রাসঙ্গিক নীতি ও সূত্র রয়েছে, যেমন শিখনের নীতি।
- (৩) চিকিৎসামূলক পদ্ধতি: শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানের সঙ্গে মানসিক ব্যাধির চিকিৎসার অতি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে।
- (৪) পরিসংখ্যান পদ্ধতি: শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানে পরিসংখ্যান পদ্ধতি ব্যাপক প্রয়োগ করা হয়।
- (৫) সাধারণীকৃত ধারণা ও সিদ্ধান্ত গঠন: শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় প্রাপ্ত সাধারণীকৃত ধারণা ও সিদ্ধান্তগুলি যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য (প্রয়োগমূলক বিজ্ঞানের মতোই)।
- (৬) ক্রমবিকাশ, বিকাশমূলক পদ্ধতি: প্রয়োগমূলক বিজ্ঞান নিত্য নতুন আবিষ্কারের ফলে ক্রমবিকাশমান। ঠিক তেমনি শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানে নিত্য নতুন আবিষ্কার হচ্ছে, যার ফলে এই বিষয়টি ক্রমবিকাশমান।
শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানের লক্ষ্য (Aims of Educational Psychology)
শিক্ষা-বিজ্ঞানের অন্যতম লক্ষ্যগুলি হল-
- (১) শিক্ষাক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যাসমাধানে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠন করা।
- (২) শিক্ষার্থীদের শিক্ষামূলক আচরণ ও বিভিন্ন ধরনের বিকাশের প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিপূর্ণ তথ্যসংগ্রহ করা, নীতি প্রণয়ন করা, প্রয়োজন মতো আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করা ও ভবিষ্যদ্বাণী করা।
- (৩) নতুন ধরনের শিক্ষণকৌশল ও বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনামূলক কর্মসূচি তৈরি।
- (৪) শিক্ষার্থীদের আচরণ বিশ্লেষণ করে তাদেরকে সমাজের সঙ্গে সংগতিবিধানের জন্য উপযোগী করে তোলা।
- (৫) শিক্ষকদের সুচিন্তিত কৌশল অবলম্বনে সাহায্য করা এবং শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাহায্য করাও শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানের লক্ষ্য।
শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানের আধুনিক প্রবণতা (Recent Trend in Educational Psychology)
আধুনিক শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানে নির্মিতিবাদ (Constructivism), শ্রেণিকক্ষে ছাত্রের বৈচিত্র্য (Student diversity in classroom) ও শিখনের ওপর বিদ্যালয় বহির্ভূত পরিবেশের প্রভাব (Out of school influences) এই তিনটি বিষয় সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা হল।
নির্মিতিবাদ (Constructivism)
শিক্ষার্থীরা নিজের বিচারবুদ্ধি ও মননের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বজগৎ সম্বন্ধে যেসব বিষয় জানতে পারে তাকেই শিক্ষামনোবিজ্ঞানে নির্মিতিবাদ (Constructivism) বলে। শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্য বলতে শিক্ষার্থীর শিখনে আগ্রহ, মনোযোগ, প্রবণতা, মনোভাব, প্রেষণা ইত্যাদির পার্থক্যকে বোঝায়। এগুলি প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে আলাদা। সার্থক শিক্ষণের জন্য শিক্ষককে এগুলির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকের গুরুত্ব ছিল প্রধান, শিক্ষার্থীর ভূমিকা ছিল গৌণ। কিন্তু আধুনিক মনোবিজ্ঞানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষা হল শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক। শিক্ষকের ভূমিকা হল শিক্ষার্থীদের প্রতি নজর দেওয়া ও শিক্ষার্থীদের সাহায্য করা। শিক্ষার্থী যখন প্রকৃতিকে চিনতে ও জানতে শিখবে তখন সে নিজে থেকেই তার কৌতূহল নিবৃত্তি শিখতে চেষ্টা করবে। প্রয়োজনে শিক্ষক তাকে সাহায্য করবেন। পিয়াঁজে, ডিউই, এডমন্ড হাসেরল (Edmund Husserl) ভাইগটস্কি (Vygotsky) জোসেফ নোভাক প্রমুখ নির্মিতিবাদের উপর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
Shuell (1996), নির্মিতিবাদের বৈশিষ্ট্যগুলি সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। যেমন-
- (ক) শিক্ষার্থী শিখনীয় বিষয়কে শুধু সংরক্ষণ বা মনে রাখে না, বিষয়টির একটি মানসিক প্রতিচ্ছবি নির্মাণ করে এবং শেখে। এই প্রতিচ্ছবি নির্মাণে শিক্ষার্থী তার বোধগম্যতা অনুযায়ী কিছু যোগ করে বা বর্জন করে। এইজন্যই নির্মিতিবাদ বলে।
- (খ) তাৎপর্যপূর্ণ তথ্যগুলিকে নির্বাচন করে এবং বর্তমান চাহিদার নিরিখে পূর্বার্জিত অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করে।
- (গ) এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষণীয় বিষয়কে অর্থবহ করার উদ্দেশ্যে শিক্ষক উল্লেখ করেননি এমন সব তথ্যও শিক্ষার্থী যুক্ত করে।
- (ঘ) এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষণীয় বিষয়কে অর্থবহ করে তুলতে শিক্ষার্থী একাধিক প্রক্রিয়ার সাহায্য গ্রহণ করে, যার ফলে শিক্ষার্থীর সক্রিয়তা অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
- (ঙ) সমাজের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া এই শিখনকে প্রভাবিত করে।
নির্মিতিবাদের কয়েকটি উদাহরণ:
যেমন-গণিতের যোগ, বিয়োগ, গুণ বা ভাগ প্রক্রিয়াগুলি সঠিকভাবে শিখন হলে, কোনো সমস্যাসমাধান করতে দিলে কী কী প্রক্রিয়াকে কাজে লাগাতে হবে সে সম্বন্ধে শিক্ষার্থীর মনে একটি মানসিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। সঠিক প্রতিরূপ নির্মিত হলেই শিক্ষার্থী সমস্যাটি সমাধান করতে পারে। এই মানসিক প্রতিরূপ গঠন করতে গিয়ে শিক্ষার্থী অনেক সময় এমন অনেক তথ্যকে সংযুক্ত করে যেগুলি হয়তো শিক্ষকের মুখ থেকে শোনেইনি। যেমন-রসায়নের ক্ষেত্রে রাসায়নিক বন্ধন বুঝতে গিয়ে বিষয়টিকে উপলব্ধি করার জন্য সামাজিক বন্ধনের সাপেক্ষে রাসায়নিক বন্ধনকে আয়ত্ত করার চেষ্টা করে।
একই শিক্ষকের কাছে একই বিষয়ে একই সময়ে একাধিক ছাত্র পড়ে, কিন্তু সব শিক্ষার্থী হুবহু একরকমভাবে শেখে না। ফলে শিক্ষক কর্তৃক বিষয়টির উপস্থাপন সকল শিক্ষার্থীদের কাছে একই রকম হয় না। প্রত্যেক শিক্ষার্থী বিষয়টিকে নিজের মতো করে মানসিক প্রতিকল্প গঠন করে এবং বিষয়টিকে নিজের মতো করে বোঝার চেষ্টা করে। এই নিজের মতো করে বিষয়ের অর্থ আয়ত্ত করা বা নিজের মতো করে বিষয়টিকে মনে রাখার চেষ্টাই হল নির্মিতিবাদের মূল কথা।
নির্মিতিবাদ বুঝতে হলে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়া দরকার- (1) সক্রিয়তা, (2) বিষয়ের অর্থ। প্রথম অর্থাৎ সক্রিয়তা বলতে বোঝায় বিষয়কে বোঝার জন্য শিক্ষার্থীর প্রচেষ্টা। শিক্ষার্থী যদি সক্রিয় না হয় তবে শিক্ষক যেভাবেই শিক্ষা দেন না কেন শিক্ষার্থীর শিখন প্রক্রিয়া সফল হতে পারে না। একই বিষয়ের উপলব্ধি বিভিন্ন শিক্ষার্থীর কাছে বিভিন্ন। এই অর্থ উপলব্ধি শিক্ষার্থীর বিষয়ের প্রতি প্রেষণা, মনোযোগ, আগ্রহ, সামাজিক অভিজ্ঞতা ইত্যাদির উপর নির্ভর করে। শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট বিষয়ে যত বেশি মনোযোগ দেবে ওই বিষয়ে তত বেশি জানতে পারবে। বিষয়ে মনোযোগ দিতে প্রয়োজন হল শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রেষণা সৃষ্টি করা। এক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উল্লিখিত শর্তগুলি অর্থাৎ প্রেষণা, মনোযোগ, আগ্রহ, সামাজিক অভিজ্ঞতা ইত্যাদি শিক্ষার্থীকে সক্রিয় করে এবং শিক্ষার্থীকে অর্থ উপলব্ধিতে সাহায্য করে, যা নির্মিতিবাদের দ্বিতীয় দিক গুরুত্বপূর্ণ।
নির্মিতিবাদের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Constructivism)
আধুনিক মনোবিদগণ নির্মিতিবাদকে দু-ভাগে ভাগ করেছেন- (a) ব্যক্তিনির্ভর নির্মিতিবাদ এবং (b) সমাজনির্ভর নির্মিতিবাদ বা সমাজভিত্তিক নির্মিতিবাদ।
- (a) ব্যক্তিনির্ভর নির্মিতিবাদ (Individualistic Constructivist): যখন কোনো ব্যক্তির মধ্যে কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে ব্যক্তির নিজস্বতার ভিত্তিতে, মানসিক প্রতিকল্প গড়ে ওঠে তাকে ব্যক্তিনির্ভর নির্মিতিবাদ বলে। যেমন-ব্যক্তি নিজে পুস্তক পড়ে বা কোনো ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কোনো বিষয়ে যদি তার মানসিক প্রতিকল্প গড়ে ওঠে তবে সেটি হল ব্যক্তিনির্ভর নির্মিতিবাদ। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্তিনির্ভর নির্মিতিবাদের অন্তর্ভুক্ত। ব্যক্তিভিত্তিক নির্মিতিবাদের মধ্যে পিয়াঁজে, ভন প্লেসার ফেল্ড (Von Glaser Feld)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
- (b) সমাজনির্ভর নির্মিতিবাদ বা সমাজভিত্তিক নির্মিতিবাদ (Social Constructivist): ব্যক্তি যখন শ্রেণিকক্ষ, বন্ধুবান্ধব, সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে বা পরিবারের বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে মানসিক প্রতিকল্প তৈরি করে, তাকে সমাজভিত্তিক বা সমাজনির্ভর নির্মিতিবাদ বলে। যেমন-কোনো পারিবারিক সমস্যা উপস্থিত হলে ব্যক্তি পরিবারের লোকজন, বন্ধুবান্ধব এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শ গ্রহণ করে। শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ করে দলগত শিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী শ্রেণিশিক্ষক, অন্যান্য শিক্ষক, বন্ধুবান্ধব প্রভৃতির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে। এইভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে মানসিক প্রতিকল্প তৈরি হয় তাকে সমাজভিত্তিক নির্মিতিবাদ বলে। সমাজনির্মিত নির্মিতিবাদের উপর ভাইগটস্কির নাম উল্লেখযোগ্য।
নির্মিতিবাদ ও শিক্ষকের কর্তব্য (Constructivism and Teacher’s Duty)
শিক্ষার্থীর মধ্যে ব্যক্তিগত হোক বা সমাজভিত্তিক প্রতিকল্প তৈরির ক্ষেত্রেই হোক শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে শিক্ষকের যেসব কর্তব্যগুলি রয়েছে সেগুলি হল-
- (১) শিক্ষার্থীর রুচি, আগ্রহ, সামর্থ্য, বয়স প্রভৃতির দিকে লক্ষ রেখে বিষয়ের অভীক্ষাপত্র বা প্রশ্নগুচ্ছ বা ইন্টারভিউ সিডিউল তৈরি করে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থিত করতে হবে। অভীক্ষাপত্র বা প্রশ্নগুচ্ছ বা ইন্টারভিউ ইত্যাদি প্রস্তুতের ক্ষেত্রে শিক্ষক নিজে কতটুকু জানেন সেটির দিকে নজর না রেখে শিক্ষার্থী কতটুকু জানে সেই দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীর মধ্যে বিষয়ের উপর কতটুকু এবং কী ধরনের মানসিক প্রতিকল্প তৈরি হয়েছে তা মূল্যায়ন করে দেখা উচিত।
- (২) অভীক্ষাপত্র বা প্রশ্নগুচ্ছ বা ইন্টারভিউ-এর ক্ষেত্রে শিক্ষকের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়া প্রয়োজন। উত্তরগুলির মধ্যে শিক্ষার্থীর মৌলিকত্ব কতটুকু প্রকাশ পেয়েছে তার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া দরকার। শিক্ষার্থীকে এমন প্রশ্ন করা উচিত যাতে তার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি, পারিবারিক পরিচয়, তার বৌদ্ধিক বিকাশ, বিষয়ের প্রতি আগ্রহ কতটা হয়েছে তা জানা যায়।
- (৩) শিক্ষার্থীর জ্ঞানভাণ্ডার কতটা সমৃদ্ধ তা জানার জন্য শিক্ষককে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন উপস্থাপন করতে হবে।
- (৪) শিক্ষার্থী বিষয়টি কতটা জেনেছে তার জন্য অভীক্ষাপত্র বা প্রশ্নাবলিকে আদর্শায়িত করা দরকার।
- (৫) শিক্ষার্থীর জ্ঞানভাণ্ডার সম্বন্ধে শিক্ষকের সঠিক ধারণা থাকা প্রয়োজন।
- (৬) শিক্ষার্থীর মধ্যে বিষয়ের সঠিক প্রতিকল্প তৈরি না হলে তার সংশোধন করা প্রয়োজন। এবং শিক্ষার্থীকে সঠিকভাবে পরিচালিত করা শিক্ষকের অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সুতরাং আধুনিক শিক্ষামনোবিজ্ঞানে নির্মিতিবাদের (Constructivism) গুরুত্ব উপলব্ধি যেমন শিক্ষার্থীদের করতে হবে; তেমনি শিক্ষক, মনোবিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষাবিজ্ঞানী প্রত্যেকেরই নির্মিতিবাদের স্বরূপ ও প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে যথাযথ জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য (Difference in characteristics of students in classroom)
ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে পার্থক্যই হল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য। একই শ্রেণিতে বিভিন্ন শিক্ষার্থীর মধ্যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য লক্ষ করা যায়। বিকাশের বিভিন্ন স্তরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে মিল থাকলেও তাদের মধ্যে পার্থক্যও কম নয়। এই পার্থক্যই ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্যের পরিচায়ক। মনোবিদ Allport-এর মতে, প্রতিটি ব্যক্তি তার নিজস্ব ভঙ্গিতে পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন করে, যার ফলে পার্থক্য দেখা যায়।
দৈহিক বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য:
(1) ওজনের পার্থক্য। (2) উচ্চতার পার্থক্য। (3) অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পার্থক্য। (4) দৈহিক শক্তির পার্থক্য। (5) কর্মক্ষমতার পার্থক্য। (6) দেহ সঞ্চালনগত পার্থক্য। (7) আকার ও অবয়বের পার্থক্য।
মানসিক বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য:
(1) প্রত্যক্ষণের পার্থক্য। (2) ভাবমূর্তিগত লক্ষ্য! (3) স্মরণ ক্রিয়ার পার্থক্য। (4) ধারণার পার্থক্য। (5) অনুরাগের পার্থক্য। (6) বুদ্ধির পার্থক্য। (7) বিশেষ ক্ষমতার পার্থক্য। (8) মনোযোগ।
প্রাক্ষোভিক বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য:
(1) মেজাজ। (2) ব্যক্তিত্বের সংলক্ষণের পার্থক্য।
শিক্ষাগত অসমতা (Educational Inequalities)
শিক্ষাগত অসমতা বলতে বোঝায় বিদ্যালয়ের বিভিন্ন পাঠ্যবিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থী কতটা পারদর্শিতা অর্জন করছে তার মধ্যে পার্থক্য। কোনো শিক্ষার্থী খুব কম সময়ে কোনো বিষয় আয়ত্ত করে। আবার আর-একজন শিক্ষার্থীর সেই বিষয় আয়ত্ত করতে অনেক বেশি সময় লাগে ইত্যাদি। এই শিক্ষাগত অসমতা পারস্পরিক সুযোগের অভাবে হতে পারে, আবার শিক্ষার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অমান্য করণে যেমন মনোযোগের অভাব শিক্ষা অর্জনে বৈষম্যের কারণে হতে পারে।
শ্রেণিকক্ষে ছাত্রদের মধ্যে বৈষম্য এবং বৈচিত্র্য স্বাভাবিক। বিদ্যালয়ের কাজ হল সমস্ত ধরনের বৈষম্য ও বৈচিত্র্যপূর্ণ শিক্ষার্থীদের সামর্থ্য অনুযায়ী জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ পারিবারিক সংগঠন নির্বিশেষে প্রত্যেকের জন্য উপযুক্ত পঠনপাঠনের ব্যবস্থা করা। রিচার্ড লার্নার 1991 তাঁর বিকাশমূলক বর্ণনা ক্রমতত্ত্বে বিকাশের ধারণার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের (দৈহিক, মানসিক, প্রাক্ষোভিক) মধ্যে সামঞ্জস্যবিধানের কথা বলেছেন। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন পর্যবেক্ষণ করে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে বৈষম্য লক্ষ করবেন। তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণলব্ধ অভিজ্ঞতাগুলিকে লিপিবদ্ধ করবেন।
এই বিবরণী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-পরিকল্পনা রচনায় বিশেষভাবে সাহায্য করে। শিক্ষার উদ্দেশ্য সফল করে তুলতে হলে ব্যক্তিগত বৈষ্যমের নীতির ওপর ভিত্তি করে পাঠক্রম ও শিক্ষণ পদ্ধতি রচনা করা প্রয়োজন। এই কারণে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় বহুমুখী পাঠক্রমের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার জন্য রয়েছে ডালটন পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনায় শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের পরিপূর্ণ বিকাশের দিকে নজর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রোজেক্ট, সমস্যাসমাধান স্বশিখন পদ্ধতিগুলিতেও ব্যক্তিগত বৈষম্যে নীতিগুলিকে কাজে লাগানো হয়।
আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীকে তাদের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের সহপাঠক্রমিক কার্যাবলির গুরুত্বের কথা বলা হচ্ছে। বর্তমানে বিদ্যালয়গুলিতে তাই বিভিন্ন ধরনের সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি চালু করা হয়েছে। যেমন- খেলাধুলা, গান, আবৃত্তি, বিতর্ক, কুইজ, তাৎক্ষণিক বক্তৃতা ইত্যাদি। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের বৈশিষ্ট্য এবং দক্ষতাসমূহকে প্রকাশ করার সুযোগ পায়। সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি অংশগ্রহণ ও উৎকর্ষতার ভিত্তিতে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বৃত্তিমূলক নির্দেশনাদান করতে পারেন। সুতরাং আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈচিত্র্যকে ভিত্তি করে তাদের সর্বাঙ্গীণ বিকাশের দিকে নজর দেওয়া হয়।
এছাড়া অবসর সময় যাপনের শিক্ষা দেওয়াও আধুনিক শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। শিক্ষার্থীরা অল্পবয়স থেকে যাতে নিজেদের পছন্দমতো কাজে পারদর্শিতা অর্জন করে এবং অবসর সময়ে সেগুলিকে কাজে লাগিয়ে সার্থকভাবে অবসর সময় যাপন করতে পারে সেক্ষেত্রে বিশেষ নজর দিতে হবে। প্রায় সব শ্রেণিকক্ষেই ব্যতিক্রমী শিক্ষার্থী দেখা যায়। উচ্চবুদ্ধিসম্পন্ন, নিম্ন-বুদ্ধিসম্পন্ন এবং শিখনে অসুবিধা-সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের ব্যতিক্রমী শিক্ষার্থী বলা হচ্ছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এদের পাঠদান করা হবে। তবে এদের শনাক্ত করে, বিশেষ চাহিদা ও সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করে বিশেষ ধরনের পাঠক্রম, প্রযুক্তির ব্যবহার সহ পাঠদান পদ্ধতি এবং মূল্যায়নের ব্যবস্থার প্রতি শিক্ষক গুরুত্ব আরোপ করবেন।
সুতরাং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের দৈহিক, মানসিক, প্রাক্ষোভিক বৈচিত্র্যকে ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় পাঠক্রম, শিক্ষাদান পদ্ধতি, সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি এবং মূল্যায়নের ব্যবস্থা করলে শিক্ষণ ও শিখন উভয়ই সার্থক হবে।
শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যালয় বহির্ভূত পরিবেশের প্রভাব (Out of school influences in Education)
আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানীদের মতে, শিক্ষা কেবল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পাঠক্রম এবং শিক্ষাদান প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত বিষয় নয়। প্রকৃত শিখন বিদ্যালয় বহির্ভূত পরিবেশের ওপরও নির্ভর করে।
শিক্ষকগণকে শিক্ষণ ও শিখনকে সার্থক করে তুলতে হলে বিদ্যালয় বহির্ভূত পরিবেশের কথাও স্মরণ রাখতে হবে। এ ব্যাপারে শিক্ষকের জানা দরকার-
- (a) শিক্ষার্থী কোন্ পরিবেশ থেকে আসছে?
- (b) শিক্ষার্থী কোন্ সমাজে বাস করে?
- (c) শিক্ষার্থীর গৃহ-পরিবেশ কীরকম?
- (d) বাবা, মা, অভিভাবকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কতখানি?
- (e) শিক্ষার্থীদের ওপর বাবা-মায়ের প্রভাব কীরকম?
- (f) শিক্ষার্থী ক্লাসের বাইরে কী ধরনের সঙ্গীসাথীদের সঙ্গে মেলামেশা করে?
- (g) খেলাধুলা, গান, বাজনা, আবৃত্তি ইত্যাদি কোন্ ধরনের সহপাঠ্যক্রমিক কার্যাবলির প্রতি শিক্ষার্থীর আগ্রহ আছে?

