স্মিথসোনিয়ান এবং এমআইটি-এর বিজ্ঞানীদের তৈরি লুমিনা সিমুলেশন (Lumina early universe simulation) কীভাবে মহাবিশ্বের অন্ধকার যুগ ও প্রথম নক্ষত্রের জন্মরহস্য ফাঁস করল, রইল তার বিস্তারিত বিবরণ।

Table of Contents
লুমিনা সিমুলেশন (Lumina Simulation): মহাবিশ্বের প্রথম ২০০ কোটি বছরের লুকানো ইতিহাস ডিকোড করলেন বিজ্ঞানীরা
বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের পর আমাদের মহাবিশ্ব ঠিক কেমন ছিল? গ্যালাক্সি বা নক্ষত্রহীন এক জমাট বাঁধা অন্ধকার স্থান থেকে কীভাবে তৈরি হলো আজকের এই আলোকিত ব্রহ্মাণ্ড? মহাকাশ বিজ্ঞানের এই দীর্ঘদিনের রহস্যের জট খুলতে এবার এক অভাবনীয় মডেল তৈরি করলেন হার্ভার্ড ও স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স, এমআইটি (MIT) এবং ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস-এর বিজ্ঞানীরা।
‘লুমিনা সিমুলেশন’ (Lumina Simulation) নামের এই যুগান্তকারী মডেলটি কেবল মহাবিশ্বের প্রথম ২০০ কোটি বছরের নিখুঁত ছবিই আঁকছে না, বরং জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের (JWST) ধারণ করা তথ্যের পেছনের নিখুঁত বিজ্ঞানকেও তুলে ধরছে।
লুমিনা সিমুলেশন আসলে কী?
লাতিন শব্দ ‘লুমিনা’-র অর্থ হলো ‘আলো’। নামের মতোই এই সিমুলেশনটি মহাবিশ্বের অন্ধকার যুগে প্রথম আলোর উন্মেষের ইতিহাস বর্ণনা করে। এটি একটি বিশাল ‘কসমোলজিক্যাল রেডিয়েশন-হাইড্রোডায়নামিক্স সিমুলেশন’ (Cosmological radiation-hydrodynamics simulation)।
সহজ কথায়, বিগ ব্যাং-এর প্রায় সাড়ে চার কোটি (৪৫ মিলিয়ন) বছর পর থেকে পরবর্তী ২০০ কোটি বছর পর্যন্ত মহাবিশ্বের মৌলিক উপাদানগুলো— যেমন সাধারণ গ্যাস, ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter) বা গুপ্ত বস্তু এবং বিকিরণ (Radiation) কীভাবে একে অপরের সঙ্গে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করেছিল, তারই একটি আক্ষরিক থ্রি-ডি (3D) রূপ হলো এই লুমিনা।
আকারের বিশালত্ব এবং সুপারকম্পিউটারের শক্তি
আগের যেকোনো কসমোলজিক্যাল সিমুলেশনের চেয়ে লুমিনা প্রায় ১০০ গুণ বড়। এটি মহাকাশের প্রায় ১.৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ বিস্তৃত একটি বিশাল এলাকাকে কভার করে। এতে রয়েছে প্রায় ৪৩২ বিলিয়ন রেজোলিউশন এলিমেন্ট, যা ডার্ক ম্যাটার এবং গ্যাসের প্রতিটি সূক্ষ্ম কণাকে ট্র্যাক করতে সক্ষম।
এত বিশাল এবং জটিল ডেটা প্রসেস করার জন্য বিজ্ঞানীদের বিশ্বের অন্যতম দ্রুতগতির সুপারকম্পিউটারের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল। আমেরিকার ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে অবস্থিত ‘ফ্রন্টিয়ার’ (Frontier) সুপারকম্পিউটারের ১৫,০০০-এরও বেশি জিপিইউ (GPU) ব্যবহার করে এই অসাধ্য সাধন করেছেন বিজ্ঞানীরা।
অন্ধকার যুগ থেকে আলোর বিচ্ছুরণ: দুই ধাপে ‘রিআয়নাইজেশন’
লুমিনা সিমুলেশনের অন্যতম বড় বৈজ্ঞানিক সাফল্য হলো, এটি একই সঙ্গে মহাবিশ্বের দুটি সবচেয়ে বড় পরিবর্তনকে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছে:
- হাইড্রোজেন রিআয়নাইজেশন (Hydrogen Reionization): গবেষকরা দেখেছেন, মহাবিশ্বের শুরুতে ডার্ক ম্যাটারগুলো এক জায়গায় জড়ো হতে থাকে এবং মহাজাগতিক জালিকা (Cosmic Web) তৈরি করে। এর টানে সাধারণ গ্যাসও সেখানে এসে জমা হয়ে প্রথম গ্যালাক্সির জন্ম দেয়। এই গ্যালাক্সির ভেতরে তৈরি হওয়া প্রথম প্রজন্মের নক্ষত্রদের অতিবেগুনি রশ্মি (Ultraviolet Light) হাইড্রোজেনের ঘন কুয়াশাকে সরিয়ে দেয়। এর ফলে মহাবিশ্ব প্রথমবারের মতো স্বচ্ছ হয়ে ওঠে এবং আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
- হিলিয়াম রিআয়নাইজেশন (Helium Reionization): হাইড্রোজেন আয়নিত হওয়ার অনেক পরে হিলিয়ামের আয়নিত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। লুমিনা সিমুলেশন প্রমাণ করেছে যে, এই দ্বিতীয় ধাপটি নক্ষত্রদের দ্বারা ঘটেনি; বরং এটি ঘটেছিল গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা অতি-সক্রিয় ‘সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল’ বা বিশাল কৃষ্ণগহ্বরদের থেকে নির্গত প্রচণ্ড শক্তির কারণে।
এই প্রথমবার কোনো একটিমাত্র সিমুলেশন একই সঙ্গে হাইড্রোজেন এবং হিলিয়ামের রূপান্তরকে নিখুঁতভাবে দেখাতে সক্ষম হয়েছে।
জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST)-এর গবেষণায় নতুন মাত্রা
বর্তমানে নাসা-র ‘জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ’ মহাবিশ্বের একেবারে শুরুর দিকের ছবি তুলে পৃথিবীতে পাঠাচ্ছে। কিন্তু টেলিস্কোপ শুধু ছবি বা স্ন্যাপশট দিতে পারে, মহাবিশ্ব কীভাবে সেই অবস্থায় পৌঁছাল তার পেছনের পদার্থবিজ্ঞানের সমীকরণটি দেখাতে পারে না।
লুমিনা প্রজেক্টের প্রধান গবেষক অলিভার জিয়ার (Oliver Zier) জানিয়েছেন, “জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে মহাবিশ্বের শুরুর দিকটা আমাদের কাছে এক নতুন ফ্রন্টিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। টেলিস্কোপ যা দেখছে তা ঠিকমতো বোঝার জন্য আমাদের থিওরি বা তত্ত্বগুলোকে নিখুঁত অনুমানে রূপান্তর করা দরকার ছিল।”
লুমিনা সিমুলেশন ঠিক এই কাজটিই করছে। বিজ্ঞানীরা এখন জেমস ওয়েবের পাঠানো ছবির সঙ্গে লুমিনার তৈরি করা ডেটা মিলিয়ে দেখতে পারবেন। যদি দুটি মিলে যায়, তবে বুঝতে হবে মহাবিশ্ব সৃষ্টি নিয়ে আমাদের থিওরি একদম সঠিক। আর যদি অমিল দেখা যায়, তবে তা বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন কোনো পদার্থবিদ্যা আবিষ্কারের দরজা খুলে দেবে।
উপসংহার
রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রটি প্রমাণ করে যে মানবজাতি মহাবিশ্বের আদি রহস্যের একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। আগামী দিনে ‘ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ’ (Nancy Grace Roman Space Telescope)-এর মতো অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সঙ্গে মিলে লুমিনা সিমুলেশন জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে প্রস্তুত।
উৎস এবং তথ্যসূত্র (Sources & References):
- গবেষণাপত্র: জিয়ার, ও. এবং অন্যান্য (২০২৬), “Introducing the lumina project: large-volume radiation-hydrodynamic simulations…”, প্রকাশিত হয়েছে Monthly Notices of the Royal Astronomical Society-তে। (জার্নাল লিংক: MNRAS / Oxford Academic)
- হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান ও এমআইটি নিউজ (MIT News): Center for Astrophysics | Harvard & Smithsonian Research Details
- সুপারকম্পিউটার ডেটা: ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি, ডিপার্টমেন্ট অফ এনার্জি, ইউএসএ (Oak Ridge National Laboratory, US DOE)।

